* কিন্তু আমিনাকে বিয়ে করার পূর্বে আব্দুল্লাহর কেনা দাসী বারাকাহ্, যিনি সদ্য বিবাহিতা ও দু'মাসের গর্ভবতী ও ফেরার পথের একমাত্র সাথী, মরুভূমিতে অসুস্থতা ও মৃত্যুকালে একমাত্র সেবাকারিনী, আমিনার মৃত্যুর পর তাকে দাফনকারিনী এবং একা মুহাম্মাদকে নিয়ে এসে দাদার হাতে তুলে দিয়ে তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর মুহাম্মাদকে মাতৃয়নেহে তিলে তিলে গড়ে তোলেন, যাকে রাসূল হওয়ার পর মুহাম্মাদ সঃ বলতেন, “আমার মায়ের পর একমাত্র ইনিই আমার মা”, তিনি বারাকাহ্। আব্দুল মুত্তালিব ও আবু তালিবের ঘরে শিশু মুহাম্মাদকে বারাকাহ্ তার সকল সত্তা নিংড়িয়ে পালন করেছেন। তার মলমুত্র সাফ, গোসল ও কাপড় ধোয়া থেকে আরম্ভ করে পঁচিশ বছর বয়সে বিবি খাদিজার সাথে বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত তিনি যে মাতৃতেের কাজ করেছেন, তার ফলেই রাসূল সঃ বারাকাহ্কে আস্তে দেখলেই দীড়িয়ে তাকে সালাম করতেন এবং কপালে চুমো খেতেন । রাসূল জীবনের বরকত্, বিস্মৃত বারাকাহ্কে তার সঠিক ভূমিকা ও মূল্যায়নে তুলে ধরার জন্য এ বইখানা। পিতার দাসী সন্তানের দাসী নয়। সন্তানদের মাতৃতুল্য মা। তারই স্বর্গীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন বারাকাহ্ ও তার রাসূল পুত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, খাতামুন নাবিয়্টান ও রাহ্মাতুল্লিল আলামীন । সঠিকভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর শৈশব, যৌবন ও নবী জীবন জানতে হলে প্রত্যেককে বারাকাহ, মুহাম্মাদ সঃ, যায়দ ও উসামাহকে জানতে হবে। এ সংক্ষিপ্ত বইখানা সে উদ্দেশ্যেই লেখা । ইসলাম ও নবীকে জানতে হলে এঁদের জানতেই হবে । তা" না হলে ইসলাম জানা হবে না। ইয়া আল্লাহ্! তুমি আমাদের তোমার শেষ নবীর উৎস, জীবন ও আদর্শ উপলদ্ধি, প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার তাওফীক
দান করো। আমীন। |
বারাকাহ্
বারাকাহ্ কে? বারাকাহ একটি হাবৃশী বালিকা । বয়স পনের ষোল বছর। মুহাম্মাদের পিতা আব্দুল্লাহ্ তাকে মক্কার ক্রীতদাস-দাসীর বাজার থেকে ক্রয় করে। মুহাম্মাদের মা আমিনা বিনৃতে ওয়াহ্বৃকে বিয়ে করার পূর্বে আব্দুল্লাহ্ তাকে ক্রয় করে । আব্দুল্লাহ্ ও আমিনার বিয়ের পর তাদের দেখা-শোনার সকল দায়িতৃ বর্তায় বারাকাহ্র উপর ।
বারাকাহ্ বলেন ৪
আমিনা ও আব্দুল্লাহর বিয়ের দু'সপ্তাহ পর আব্দুল্লাহর বাবা আব্দুল মুত্তালিব আমাদের বাড়ী এসে বললো, “আব্দুল্লাহ্ তৈরী হও । তোমাকে সিরিয়াগামী সওদাগরী কাফেলায় ব্যবসার জন্য যেতে হবে ।” এ কথা শোনামাত্র আমিনা আর্তনাদ করে বলে, “আশ্চর্য! আশ্চর্য!! কিভাবে আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে এতো দূর দেশ সিরিয়া যাবে? এখনো যে আমি নববধূ! এখনো তো আমার হাতের মেহ্দীর রং যায় নি!” আব্দুল্লাহর মনের অবস্থাও তাই। কিন্তু সে রাশভারী শ্রদ্ধেয় পিতার নির্দেশের বিরোধিতা করতে পারে কি?
13 ///-99090০901.০011/819911799
অনিচ্ছা সতেও তাকে দীর্ঘ পথের যাত্রায় পা বাড়াতে হলো । আব্দুল্লাহ্ রওয়ানা হয়ে বাড়ীর সীমানা পার হওয়ার পরই আমিনা বেহুশ হয়ে পড়ে যায় দোর গোড়ায় ।
বারাকাহ বলেন ঃ
আমি যখন আমিনাকে পড়ে যেতে দেখলাম, দুখে আর্তনাদ করে বললাম, “কি হয়েছে তোমার! তুমি যে পড়ে গেলে?” আমিনা চোখ খুলে আমার দিকে তাকালো । তার গাল বেয়ে অশ্রুর বন্যা । জবাবে ক্ষীণ কষ্ঠে আমিনা আমাকে এরপর আমিনা বিছানায় পড়লো । সে কারো সাথে কথা বলেনা । এমন কি যারা সাক্ষাৎ করতে আসে, তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। একমাত্র শ্বশুর আব্দুল মুত্তালিব আসলে তার সাথে আদব রক্ষার্থে শুধু কুশল বিনিময় করে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বারাকাহ্ তার জীবনের ইতিহাস বর্ণনা করেন। অশ্রুতে তার চোখ টলমল করে। আকাশের
দিকে তাকিয়ে পুনঃ বলেন £
আব্দুল্লাহর চলে যাওয়ার প্রায় দু'মাস পর একদিন ফজরের পর আমাকে কাছে ডেকে আমিনা বলে, “আমি এক আজব স্বপ্ন দেখেছি আজ রাতে । দেখছি যে আমার জঠর থেকে একটি আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সারা মন্কাহ উপত্যকাকে আলোকিত করে ফেলেছে ।” আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি গর্ভ অনুভব করছো?” উত্তরে আমিনা বললো, “কি-জানি, মনে তো তাই হয়। কিন্তু গর্ভধারণ করলে মেয়েদের যে উপসর্গ দেখা দেয়, আমি যে তা অনুভব করছি না?” জবাবে আমি বললাম, “মনে হয় তোমার এমন একটি সন্তান হবে, যার দ্বারা মানব জাতির কল্যাণ হবে ।” এরপর আরো কিছুদিন কেটে যায়। আব্দুল্লাহর কোনো খবর নেই। তার ফলে আমার ও আমিনার দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। আমিনার অবস্থা এতোই করুণ যে তার শরীর স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে । আমি তাকে সর্বক্ষণ বিভিন্ন গল্প কাহিনী ও দুশ্চিন্তা বিদুরণের কথা-বার্তা বলে সান্তনা দিতে সচেষ্ট ছিলাম । আমি সর্বক্ষণ পাশে না থাকলে কি হতো বলা যায় না। এভাবে দিন কাটছে আমাদের দু'জনের । একদিন সকালে আব্দুল মুত্তালিব উৎ্ক্ঠার সাথে আমাদের ঘরে প্রবেশ করে এবং কোনো ভূমিকা না করেই বলল, “আমিনা তৈরী হও । আমাদের মন্কাহ নগরী ছেড়ে বাইরে যেতে হবে ।” আমিনা আশ্চর্য হয়ে বললো, “কি হয়েছে বাবা, আমরা কেনো নগরী ত্যাগ করে বাইরে যাবো?” উত্তরে আব্দুল মুত্তালিব বললো যে, বাদশাহ্ আব্রাহা মক্কাহ আক্রমণ করতে আসছে। সে মন্কাহ্ দখল করে কা'বা ধ্বংস করবে, কৌরেশদের উৎখাত করবে এবং ছেলে মেয়েদের দাস-দাসীরূপে ধরে নিয়ে যাবে । তদুত্তরে আমিনা বললো, “বাবা, আপনি দেখছেন আমি অসুস্থ ও শোকাহত, আমি এতো দুর্বল যে হেটে আমি পাহাড়ে চড়তে পারবো না।” আব্দুল মুত্তালিব বলল, “কিন্ত আমার যে দুশ্চিন্তা হচ্ছে তোমার এবং তোমার পেটের সন্তানের জন্য!”
14 ///-99090০901.০011/819911799
আমিনা বললো, “বাবা, আবরাহা মক্কাহ্ প্রবেশ করতেও সক্ষম হবে না, কা'বাও ভাঙ্গতে পারবে না। কারণ, কা'বার মালিক আছেন, তিনি তা রক্ষা করবেন ।” আব্দুল মুত্তালিব বললো, “কিন্তু আব্রাহা ও তার সেনাবাহিনী মক্াহ থেকে মাত্র দু'মাইল দুরে, আক্রমণের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে! আমরাও অন্যান্যদের মতো মক্কাহ ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেই- সেটাই উত্তম ।” কিন্তু আমিনা এ ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ শুনে মোটেও বিচলিত হলো না। যেনো সংবাদটি কোনো চিন্তারই বিষয় নয়। তা দেখে আব্দুল মুত্তালিব রেগে যায় এবং বলে, “কোনো কথার প্রয়োজন নেই। আমিনা কাপড় চোপড় ও জিনিস পত্র গুছিয়ে তৈরী হও । বারাকাহ্, তুমিও সব গুছিয়ে তৈরী হও। তৈরী হয়ে তোমরা দু'জন আসো । আমি তৈরী হয়ে তোমাদের অপেক্ষায় থাকবো ।” এর মধ্যেই অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেলো। আক্রমণকারী আব্রাহার প্রকান্ড হাতি হাটু গেড়ে বসে পড়েছে । আর উঠেনা, একপাও অগ্রসর হচ্ছে না। হাতিকে তোলার জন্য সৈন্যরা তাকে লৌহদন্ড দিয়ে আঘাত করলো, হাতি দীড়ালো বটে কিন্তু একপাও আর সামনে আগাচ্ছে না। তখনই ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখী বিষাক্ত পাথর কুচি নিক্ষেপ করে আবরাহা ও তার সেনা বাহিনীকে নির্মূল করে দিলো। কা'বা রক্ষা পেলো এবং মক্কাহ্র মাহাত্ম আরো বাড়লো । আমি সর্বক্ষণ আমিনাকে চোখে চোখে রাখি । দিবানিশি তার চোখ ও চেহারার দিকে তাকাই । আমিনা যেনো তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলো আব্দুল্লাহর বিরহে ও দুশ্চিন্তায় । আমি রাতেও তার পাশে শুতাম। আমি শুনতে পেতাম যে আমিনা ঘুমের মাঝেও যেনো আব্দুল্লাহর সাথে স্বপ্নে কথা বলছে । কখনো আমি তার আর্তনাদে জেগে যেতাম এবং তাকে বিভিন্ন ভাবে প্রবোধ দিয়ে, সান্তনা দিয়ে উৎসাহিত করতাম । এভাবেই আমাদের দিন কাটছিলো। তার দু'মাস পর সওদাগরী কাফেলা সিরিয়া থেকে ফেরৎ আসা আরম্ভ হলো। এক এক কাফেলা পৌঁছুলেই তাদের আত্মীয় স্বজনেরা তাদের আগ বেড়ে গিয়ে স্বাগত জানিয়ে নগরীতে নিয়ে আসতো । কোনো কাফেলা এলেই আমি চুপি চুপি গিয়ে আব্দুল মুত্তালিবের নিকট থেকে আব্দুল্লাহর সংবাদ নিতে যেতাম। কোনো সংবাদ না পেয়ে আমি পুনঃ চুপি চুপি বাড়ী চলে আসতাম । আমিনাকে কিছুই জানতে দিতাম না। পাছে কোনো সংবাদ নেই শুনতে পেয়ে আমিনা আরো ভেঙ্গে পড়ে! এভাবে একে একে সকল কাফেলা ফেরত আসে । কিন্তু আব্দুল্লাহ্ ফিরেনি। ব্যাপারটি আমাকেও বিচলিত করে তুললো । তাই একদিন সকালে খুব উদ্বেগ নিয়ে আব্দুল মুস্তালিবের নিকট গেলাম। গিয়েই দুঃসংবাদ পেলাম । মাদীনাহ থেকে আব্দুল্লাহর মৃত্যুর সংবাদ এসেছে। সংবাদ শুনে বজ্বাহতের মতো হতভন্ত হয়ে যাই। দুঃসংবাদের আকস্মিকতা এমনই ছিলো যে আমার মনে পড়ে যে, সংবাদ শুনে আমি চিৎকার করে বসে পড়ি। তারপর প্রায় জ্ঞান হারা হয়ে আমি কাদতে কীদতে বাড়ী পৌছে প্রিয়কে চিরতরে হারানোর শোকে বিলাপ করতে থাকি। আমার অবস্থা দেখেই আমিনা সব বুঝে যায় । আমিনা কোনো প্রকার ছুটে গিয়ে বিছানায় পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ।
15 ///-99090০901.০011/819911799
এরপর আর আমিনা শয্যা ছেড়ে উঠতে পারেনি । আমি ছাড়া বাড়ীতে আমিনার পাশে দ্বিতীয় কোনো প্রাণী ছিলো না। আমার শোকের বোঝা নিয়ে আমি সর্বদা আমিনাকে ঘিরে থাকি । তার সেবা যত, তাকে প্রবোধ দেয়া ও মনোবল দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখা আমার একমাত্র জীবনের ব্রত হয়ে যায়। কারণ, আমিনার পেটে যে আমার প্রিয়ের চিহ্ন পূর্ণতা লাভ করছে! তার যত চাই। এভাবে দিনরাত প্রহর গোনার পর আমিনা মুহাম্মাদকে প্রসব করে। প্রসবের পর সর্ব প্রথম আমি মুহাম্মাদকে দু'হাতে তুলে আমিনার পাশে দেই। মুহাম্মাদ শেষ রাতে জন্মায়। ভোর হওয়ার পর খবর পাঠালে আব্দুল মুত্তালিব আসে ও অন্যান্যরাও আসে । মুহাম্মাদকে পেয়ে আমরা আব্দুল্লাহকে ফিরে পাই । জমাট আঁধার শেষে যেনো বেঁচে থাকার আশার আলো জলে ওঠে । মুহাম্মাদের জন্মে আব্দুল মুত্তালিবসহ পরিবারের সবাই আনন্দিত হয় এবং মহা সমারোহে জন্মোৎসব করে । আব্দুল মুত্তালিব শিশু মুহাম্মাদকে কোলে করে কাবায় গিয়ে তাওয়াফ করে ঘোষণা দেয়, “এ হলো মুহাম্মাদ, আমার ছেলে, এ হলো আব্দুল্লাহর বরকতময় স্মৃতি ।” আরবরা, বিশেষ করে মন্কাহ্বাসী, শিশুদের দুধ পান ও মরুভূমির স্বাস্থ্যকর মুক্ত বায়ুতে লালনের জন্য পয়সার বিনিময়ে ধাত্রীদের কাছে দত্তক দিতো ।
বারাকাহ্ বলেন 8
মক্কা উপত্যকার বাইরে মরুবাসী ধাত্রীরা পালনের জন্য শিশুদের নিতে আসতো । মুহাম্মাদ দরিদ্র বিধবা মায়ের সন্তান বিধায় দুগ্ধীদাত্রীরা কেউ তাকে নিলো না । যারা প্রচুর টাকা দিতে সক্ষম, তাদের সন্তানদেরই তারা আগ্রহ ভরে নিলো। হালিমা সাদীয়া নায়ী এক দুগ্ধাদাত্রী সবার শেষে আসলো । কারণ, তার বাহন গাধীটি এতোই রোগা ও দুর্বল ছিলো যে তার মক্কাহ পৌছতে বিলম্ব হয়ে গিয়েছিলো । অন্য কোনো শিশু না পেয়ে হালিমা মুহাম্মাদকে নিতে বাধ্য হলো । কিন্তু আল্লাহ্ পাকের কুদরত! ফেরার পথে হালিমার রোগা গাধীটি তেজী আরবী ঘোড়ার গতিতে বাড়ী ফিরলো মুহাম্মাদকে নিয়ে । তারপর এতীম শিশু মুহাম্মাদের ভাগ্যে হালিমার দৈন্যদশা দূর হয়ে গেলো। তার ভেড়া বকরির পাল মোটাসোটা হতে আরম্ভ করলো। প্রচুর দুধ দিতে লাগলো এবং দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে হালিমার ঘর ভরে দিলো । চারি দিক থেকে হালিমার সংসারে বরকত উপৃচে আসতে লাগলো । হালিমার সঙ্গী যে সমস্ত ধাত্রীরা দারিদ্রের জন্য তাকে অবজ্ঞা করেছিলো, হালিমার ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে পেয়ে তার প্রতি ঈর্ষা পরায়না হয়ে উঠলো । তারা কি জানতো যে এ সমস্ত আমার মুহাম্মাদের বরকতে হয়েছিলো! এভাবে মুহাম্মাদ ছ'বছর বয়সে পৌছালো। আমিনা সিদ্ধান্ত নিলো যে, সে তার স্বামী আব্দুল্লাহর কবর যিয়ারতের জন্য মাদীনাহ্ যাবে। এ সফর বেশ কষ্টসাধ্য ছিলো । শিশু মুহাম্মাদ ও শোকাহত আমিনাকে নিয়ে এ সফরে যাত্রা আমাকে চিন্তিত করলো । আমি এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিবকে আমার আশঙ্কা সম্পর্কে জানালাম । এক সকালে আব্দুল মুত্তালিব এলো । সে আমিনাকে এ কষ্টকর সফর থেকে বিরত রাখতে চাইলো । কিন্তু আমিনা তার অটল সংকল্পের কথা জানালে আব্দুল মুত্তালিব অগত্যা রাজী হয়।
16 ///-99090০901.০011/819911799
একদিন আমি, আমিনা ও মুহাম্মাদ উটের পিঠে এক পাক্কীতে চড়ে সিরিয়াগামী এক বিরাট কাফেলার সঙ্গী হয়ে মাদীনার পথে যাত্রা করলাম । কাফেলা যখন মাহ থেকে রওয়ানা হয়ে দুঁমাইল দূরে পৌছলো, মরু কাফেলার গায়করা তাদের গান ধরলো । এ গান শুনলে উটেরা তাদের গতি বৃদ্ধি করে তালে তালে গন্তব্যের দিকে ছুটে । ওদের যেনো নেশায় ধরে। আমরা চলছি এ দীর্ঘ যাত্রায়, ধূধূ মরুভূমির বুক চিরে । আমি চেয়ে দেখি আমিনার দু'চোখ দিয়ে অশ্রুর ধারা বেয়ে চলছে। আমি তাকে বললাম, “তুমি সাহসী হও, ধৈর্য্য ধারণ করো তোমার শিশু ছেলের সামনে । তা'না হলে সেও যে ভেঙে পড়বে!” আমরা যে মুহাম্মাদের বাবার কৃবর যেয়ারতে যাচ্ছি, একথা শিশু মুহাম্মাদকে জানতে দেইনি । কচি শিশু না আবার শোকাহত হয়! এভাবে আমরা দিনের পর দিন চলছি মরুভূমি দিয়ে । দীর্ঘ পথ। পুরোটা পথই আমিনা তার প্রাণ প্রিয় স্বামীর স্মৃতিতে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করি। অন্য দিকে মুহাম্মাদের দিকে আমিনার খেয়ালই নেই। সে তো আমার গলা ধরে, কোলে ঘৃমাচ্ছে। যখনই উচু-নিছু পথে চলাকালে উটের ঝাঁকুনীতে মুহাম্মাদ জেগে উঠতো, তারপর পুনঃ শক্ত করে আমার কণ্ঠ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তো । এভাবে দশ দিন পর আমরা মাদীনাহ্ পৌছে মুহাম্মাদের মাতৃকুল বনুন্ নাজ্জারদের আতিথেয়তায় উঠি। মাদীনাহ্ পৌছে এক দিনও বিশ্রাম না নিয়ে আমিনা ও আমি চল্লিশ দিন প্রত্যহ আব্দুল্লাহর কবরস্থলে যাই । সকাল থেকে সন্ধ্যা এভাবে কেঁদে কেঁদে আমিনা আরো দুর্বল হয়ে যায়। আমরা মুহাম্মাদকে সঙ্গে নেইনি। তার বয়স মাত্র ছ'বছর। এ বয়সে তাকে পিতৃশোকে ফেলতে চাইনি । তাই তাকে মাদীনায় তার সমবয়সী শিশুদের সাথে খেলতে দিয়ে আমরা দু'জন আব্দুল্লাহর কবরে চলে যেতাম । শোকে আমিনা ভীষণ দুর্বল হয়ে গেলো। তারপর পুনঃ আমরা রওয়ানা হলাম মক্কার পথে । পথে আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়লো । তার জবর হলো । জর দিন দিন বেড়ে এমন হলো যে, একদিন আমিনা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো । আমরা তখন মক্কাহ্ ও মাদীনার মাঝ পথে । “আব্ওয়া” নামক এক গায়ের কাছে। আমাদের জন্য কাফেলা একদিন দেরী করলো। কিন্তু আমিনার সুস্থ হয়ে উঠার কোনো লক্ষণ না দেখে কাফেলা আমাদের রেখে চলে আসলো। দিন রাত আমি একা আমিনার সেবা করছি। আমার জানা মতে যতো চিকিৎসা ছিলো, তা*আমি মরুভূমির লতা গুলা দিয়ে করলাম। এক কাল রাত্রিতে যেনো আমার মাথায় বাজ পড়লো । আমিনার জবর এমন বাড়লো যে আমি হাত দিয়ে দেখি গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি তাৎক্ষণিক আশঙ্কা ও পরবর্তী পরিস্থিতির কথা ভেবে কাঠ হয়ে গেলাম । আমিনার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে লাগলো । এক পর্যায়ে আমিনা ডুবে যাচ্ছে বলে মনে হলো । প্রতি মুহুর্তে যেনো বিদায়ের দিকে এগুচ্ছে। আমি অপলক দৃষ্টিতে আমিনার মুখের দিকে তাকিয়ে তার সেবা করতে লাগলাম, আর আগত বিপদের শঙ্কায় বিমূঢ় হতে থাকলাম । এর মধ্যে মুহুর্তের জন্য আমিনা চোখ খুললো । আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে আরো কাছে ডাকলো । আমি তার মুখের দিকে ঝুঁকে তার কথা শুনতে চাইলাম ।
আড়ষ্ট কষ্ঠে আমিনা আমাকে বললো ঃ
“বারাকাহ্, আমার বিদায় । মুহাম্মাদের ব্যাপারে তোমাকে বলে যাচ্ছি, মুহাম্মাদ তার বাবাকে হারিয়েছে যখন ও আমার পেটে । এখন আমি তোমার চোখের সামনে তাকে একা রেখে বিদায় নিচ্ছি। ওর তো পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আর কেউ রইলো না। তুমি আমাকেও পেলেছো। আমার পর তুমিই মুহাম্মাদের মা, মুহাম্মাদের সব। মুহাম্মাদকে তোমার হাতে তুলে দিলাম । তাকে তুমি কখনো তোমার থেকে পৃথক করো না।”
17 ///-99090০901.০011/819911799
আমি আমিনার অন্তিম কথাগুলো শুনছিলাম আর চোখের পানি দিয়ে অন্ধকার রাতে মরুভূমির বালুকে সিক্ত করছিলাম। তার কথা শুনে আমি আর আমাকে স্থির রাখতে পারলাম না। আব্দুল্লাহর ঘরে আমি আমিনার পূর্বে এসেছি। আব্দুল্লাহর দেখা-শোনা করেছি। বিয়ের পর আব্দুল্লাহ্ ও আমিনা উভয়ের সেবা যত্র করেছি। আব্দুল্লাহ্ যেনো না বলেই হারিয়ে গিয়েছিলো । তারপর আমিনাকে নিয়ে আমার জীবন ছিলো । তারপর আব্দুল্লাহর চিহ্ন স্বরূপ আসলো মুহাম্মাদ। এখন আমিনাও চলে যাচ্ছে আমাকে একা মরুভূমিতে রেখে । আমি মুহাম্মাদকে নিয়ে কিভাবে ভবিষ্যতে আমিনা ও আব্দুল্লাহর আমানত রক্ষা করবো, এ সমস্ত কথা একত্রে জড়ো হয়ে মরুভূমির ভয়ঙ্কর একাকীত্ব আমাকে আড়ষ্ট করে ফেলেছিলো। আমার বুক ফেটে কান্না আসলো । নিজেকে আমি আর সামলাতে পারলাম না। অপ্রতিরোধ্য কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম আমি । আমার কীন্না দেখে মুহাম্মাদ তার মায়ের বুক জড়িয়ে কাদতে লাগলো । মুহাম্মাদ তার মায়ের কণ্ঠ দু'হাতে জড়িয়ে কাদছে। আমি অন্তিম পথের যাত্রী আমিনার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি। এমন সময় আমিনা একটু ঝাকুনি দিয়ে চোখ বন্ধ করে বিদায় নিয়ে চলে গেলো ।
সস সুর সংসসুর সংসংসং
এতো দিনের পুরাতন স্মৃতি বারাকাহ্ বলেছেন, তার লালন পালন ও যত্রে মুহাম্মাদ বড় হয়ে “খাতামুন্ নাবিয়্টান” “রাহমাতুল্লিল আলামীন” হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার পর। তখন মুহাম্মাদ বিশ্বের বিস্ময়, আর বারাকাহ্ তার “বরকত” বারাকাহ্্র স্মৃতিচারণ । দ্বিতীয় খলীফাহ্ ওমর বিন্ খাত্তাবের খেলাফতের আমলে বারাকাহ্ ইন্তেকাল করেন। প্রায় ষাট বছর পূর্বের ঘটনা বলতে গিয়ে বারাকাহ কীন্নায় ভেঙ্গে পড়েন ও বলেন ৪ আমার দু'হাত দিয়ে মৃত মায়ের কণ্ঠ থেকে মুহাম্মাদকে পৃথক করে মুহাম্মাদের সে কচি হাত দু'খানা আমার গলায় জড়িয়ে আমি তাকে আমার বুকে নিলাম। মুহাম্মাদ ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুঢ়ু হয়ে সজোরে কীদছিলো। কোনো অবস্থাতেই সে আমার কণ্ঠ ছাড়ছিলোনা । সে অবস্থায়ই আমি আমার এ দু'হাত দিয়ে মরুভূমির বালি সরিয়ে কবর খুদে তাতে আমিনাকে শুইয়ে দিয়ে বালু দিয়ে ঢেকে আমার অবশিষ্ট চোখের পানি দিয়ে ভিজিয়ে ছিলাম । রাতের বেলা । অন্ধকার মরুভূমি। হু হু করে মরুর বাতাস বালু উড়িয়ে যেনো আমার কান্নায় শরীক হয়েছিলো । এভাবে রাত পোহালো। মুহাম্মাদকে বুকে জড়িয়ে আমি পুনঃ উটে করে মন্কার পথে রওয়ানা হলাম। মক্কাহ পৌছে মুহাম্মাদকে নিয়ে আব্দুল মুত্তালিবের ঘরে উঠলাম । আমি আর মুহাম্মাদ, এই আমার জীবন । আব্দুল মুত্তালিবের ঘরে দু'বছর যেতে না যেতেই সেও বিদায় নিলো। আমিনার মৃত্যুকালে মুহাম্মাদ ছ'বছরের ৷ দাদার মৃত্যুকালে তার বয়স আট বছর। আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর আমাদের আশ্রয় জুটলো আবু তালিবের ঘরে । আবু তালিব অত্যন্ত গ্লেহশীল ছিলো । তার সংসার অভাবের সংসার । সংসারে সন্তান অনেক কিন্তু আয় কম। আমি মুহাম্মাদকে আমার অন্তর নিংড়িয়ে গ্নেহ যত্র করে পালছি। অপর দিকে দরিদ্র চাচার সংসারের বোঝা হালকা করার জন্য মুহাম্মাদকে দিয়ে মেষ-বকরি চরিয়ে বৃদ্ধ আবু তালিবের সংসারে কিছু আয়ের সংস্থান করেছিলাম । মুহাম্মাদও এতো বিচক্ষণ ছেলে ছিলো যে, সে তার ম্নেহপরায়ন চাচার কষ্ট সম্যক বুঝেছিল। এরপর সে নিজে উদ্যোগী হয়ে মেষ বকরী পেলে তার আয় দিয়ে চাচার সংসারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো । এভাবে আমি মুহাম্মাদকে লালন পালন করি । মুহাম্মাদ এমন আদর্শ ছেলে হিসাবে বড় হয় যে, তার পঁচিশ বছর বয়সে মক্কার সবচেয়ে ধনাট্য ও সন্ত্রান্ত মহিলা খাদিজা তাকে বিবাহ করে। এভাবে আমি পুনঃ খাদিজার ঘরে মুহাম্মাদকে নিয়ে প্রবেশ করি। জন্ম থেকে এ পর্যন্ত আমি মুহাম্মাদ থেকে পৃথক হইনি এবং মুহাম্মাদও আমার কাছ থেকে পৃথক হয়নি। খাদিজার সাথে বিবাহের পর আমাদের উভয়ের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নেমে আসে । মুহাম্মাদ আমাকে আম্মা (ইয়া আম্মাহ) বলে ডাকতো । খাদিজার সাথে বিয়ের কিছুদিন পর এক সকালে মুহাম্মাদ এসে
আমাকে বলে ঃ
“আম্মা, এখন তোমার ছেলে তোমার গ্নেহ্যত্রে বড়ো হয়ে বিয়ে শাদী করে নিজের সংসার করেছে। মাগো, সারাটি জীবন দিয়ে তুমি আমার সুখ শান্তিই কেবল দেখেছো । কিন্তু তোমার যে কোনো সংসার হলো না মা! এখন যদি
18 ///-99090০901.০011/819911799
কোনো আল্লাহ্র বান্দাহ্ এসে তোমাকে চায়, তুমি কি মা রাজী হবে?” উত্তরে আমি বললাম, “সে কেমন কথা! আমি যে তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবো না। তুমিই কি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?” উত্তরে মুহাম্মাদ উঠে এসে আমার গলা জড়িয়ে আমার কপালে চুমো খেলো এবং হেসে তার স্ত্রী খাদিজার প্রতি
তাকিয়ে বললো, ১1 43815 4 1]
“দেখো, এ হলো বারাকাহ্, আমার মা, আমার মায়ের পর ইনিই আমার মা, আমার মূলের অবশিষ্ট, বাকীইয়্যাতু আহ্লী।” এ বলে মুহাম্মাদ যেনো তার স্ত্রী খাদিজাকে ইংগিত করলো, “তুমি মাকে বুঝাও । মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ভালো বোঝে ।” একথা বলে মুহাম্মাদ বাইরে চলে গেলো । খাদিজা আমার আরো কাছে এসে আমাকে বুঝিয়ে বলতে
লাগলো £
“বারাকাহ্, তুমি তোমার যৌবন ও সারা জীবন মুহাম্মাদের জন্য উৎসর্গ করে তাকে লালন করে সোনার মানুষ রূপে গড়েছো বলে তার মতো স্বামী আমার নসীবে জুটেছে। তুমি মুহাম্মাদের যেমন মা, আমারও মা। এখন মুহাম্মাদ ও আমি তোমার কিছু খণ পরিশোধ করতে চাই। তুমি আমাদের দু'জনের দিকে তাকিয়ে আমাদের খুশীর জন্য রাজি হও । একদম বুড়ো হলে যে এভাবেই তোমার জীবন শেষ হয়ে যাবে ।” খায্রাজী এসেছে প্রস্তাব নিয়ে। দোহাই তোমার, আমাদের বাসনা পূর্ণ হতে দাও।” মুহাম্মাদ ও খাদিজার প্রস্তাব উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সহজ ছিলো না। আমি রাজি হলাম । আমার বিয়ে হলো। আমি মাদীনাহ্ চলে গেলাম । সেখানে আল্লাহ্ আমাকে একটি সন্তান দিলেন। আমি তার নাম রাখলাম “আইমান্”। তখন থেকেই লোকেরা আমাকে “উম্মে আইমান” নামে ডাকতে শুরু করে কিন্তু আমার বিয়ে বেশী দিন স্থায়ী হলো না। আমার স্বামী মারা গেলো । আমি পুনঃ আমার ছেলে মুহাম্মাদ ও খাদিজার সংসারে মন্কায় চলে আসি। এবার যখন আমি মক্কায় মুহাম্মাদ ও খাদিজার সংসারে আসি, তখন এ সংসারে মুহাম্মাদ ও খাদিজার সাথে আলী ইব্ন্ আবু তালেব ও যায়দ্ ইব্ন্ হারিসাহও যোগ হয়। আলীকে মুহাম্মাদ তার চাচার দারিদ্য-পীড়িত সংসার থেকে চাচার গ্নেহ-মমতার কিছুটা প্রতিদান স্বরূপ নিয়ে আসে । তাকে নিজ ঘরে পালন করে। কিন্তু যায়দ্ ইব্ন্ হারিসাহ্ কে? কিভাবে যায়দ্ মুহাম্মাদের নিকট আসলো, এবং কিভাবে সে মুহাম্মাদের নবুওতের পূর্বে ও পরে তার সাথে সম্পৃক্ত হলো? এ আরেক অস্বাভাবিক ঘটনা ।